বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:৪৪ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
ক্ষমতার জন্য বিএনপি দেশের স্বাধীনতা বিকিয়ে দিতেও দ্বিধাবোধ করে না: ওবায়দুল কাদের জনগণকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হবার আহবান প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ ॥ বিএনপির রাজনীতি রক্ত-লাশের : তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী শত বছর পর বরিশাল জেনারেল হাসপাতাল ২৫০ শয্যায় উন্নীত হচ্ছে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সকল সেবা এক জায়গা থেকে নিশ্চিত করতে হবে : প্রধানমন্ত্রী জনগণের ভোগান্তি লাঘবে সম্পূর্ণ ভূমি ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজড করা হচ্ছে : প্রধানমন্ত্রী দেশব্যাপী কোভিড-১৯ এর ২য় ডোজ গণটিকা দান কর্মসূচি শুরু আগামী ১২ সেপ্টেম্বর শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরু হবে : শিক্ষামন্ত্রী ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য আরও ২শ’ কোটি টাকা প্রণোদনা ঋণ দেয়া হচ্ছে পঞ্জশিরে জোর লড়াই ॥ সরকার গঠনের প্রস্তুত তালেবান
ঢাকাইয়া আদিবাসী এবং ঢাকাইয়া আদিবাসীদের ভাষা।

ঢাকাইয়া আদিবাসী এবং ঢাকাইয়া আদিবাসীদের ভাষা।

ঢাকাইয়া বলতে আমরা বুঝি যারা ঢাকায় থাকে বা যাদের বাড়ী ঢাকা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ঢাকাইয়া আদিবাসী কারা?

প্রত্যকেটা গ্রামের বা জেলার একদল আদিবাসী থাকে। যারা যুগযুগ ধরে সেই এলাকায় থাকছে।

যেমন বাংলাদেশের আদিবাসী বলতে আমরা সাঁওতাল, চাকমা, মারমা, মগ, মনীপুরি, খাসিয়া, রাখাইন, লুসাই, বর্মন অথবা হাজং, মুন্ডা উপজাতিদের বুঝায়। এ ক্ষেত্রে কিছুটা বিতর্ক আছে যে উপজাতি না আদিবাসী বলা হয় এর জন্যই যে তারা তাদের পুর্বপুরুষদের সংস্কৃতি বা ধর্ম বা ভাষা ধর্মান্তরিত করে নাই। তারা এখনো নিজেদের পুর্বপুরুষদের সংস্কৃতি ভাষা লালন করে চলছে।

কিন্তু ঢাকাইয়া আদিবাসী কারা?

ঢাকাইয়া আদিবাসীদের ব্যপারে জানতে হলে আপনাকে আগে ঢাকার ইতিহাস জানতে হবে।

বর্তমানে প্রচলিত ঢাকার ইতিহাস ঐতিহাসিকদের মতে আমরা যেটা জানতে পারি সেটা হচ্ছে, মুঘল বাদশা জাহাংগীর আমলে সুবেদার ইসলাম খান ১৬০৮ সনে ঢাকা কে সুবেহ বাংলার রাজধানী হিসাবে প্রথম আবাদি বসতি স্থাপন করা শুরু করেন। তার আগে বর্তমান এর যে রাজধানী ঢাকা কে আমরা চিনি সেটা ঘনজঙ্গলে ভরা ছিলো। সুলতানি আমল বা পাঠান আমলের ঢাকা কেন্দ্রিক ঘনবসতি ছিলো বর্তমানের পানামনগরী খ্যাত সোনারগাঁয়ে, যার নিদর্শন এখনো অবশিষ্ট আছে। ঢাকার ভেতর বারো ভুঁইয়া বা পাল এবং সেন বংশের আমলের কিছু মসজিদ, মন্দির এবং মঠ কেন্দ্রিক অল্প পরিসরে কিছুটা জনবসতি ছিলো তবে বেশী ভাগিই ছিলো বনাঞ্চল।

ছবি – বড় কাটরা, ১৮৭০ সাল। (উইকিপিডিয়া)

সুবেহ বাংলা বলতে বুঝাচ্ছে, পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা, বিহা্র, উড়িষ্যা এবং ত্রিপুরা রাজ্য নিয়ে অবিভক্ত সুবেহ বাংলা।

এখন ১৬০৮ সনে ইসলাম খান ঢাকাকে বাংলার রাজধানী হিসাবে জাহাঙ্গীরনগর নামকরন করেন, কিন্তু ঢাকা নামটি কখনো লোক মুখে বিলুপ্ত হয়নাই।

কিন্তু এই ইসলাম খান এর আমলেই জনবসতি স্থাপন এবং শহর হিসাবে বুড়ীগঙ্গার তীরে ঢাকা প্রথম প্রকাশ পাওয়া শুরু করে। পরবর্তীতে শায়েস্তা খান এর আমলে এর খ্যাতি সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পরে।

সেই ১৬০৮ থেকে ঢাকায় মুঘল সুবেদারগন এবং পরবর্তিতে নওয়াব গন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থাপনা নিদর্শন তৈরী করেন এবং তাদের সাথে আসা উচ্চপদস্থ – নিম্নপদস্থ কর্মচারীগণ, সৈন্যগন বিভিন্ন স্থানে তৎকালীন সরকারী ভাবে তৈরী পাড়া বা মহল্লায় বাসাবাড়ীতে থাকা শুরু করেন। এবং চারশত বছর ধরে থাকা এদের বংশের লোকরাই হচ্ছেন আজকের যুগের ঢাকাইয়া আদিবাসী পরিবারগুলো। এর প্রমান পাওয়া যায় বিভিন্ন এলাকার নামকরণ থেকে, আলওর বাজার (আলু বাজার), কসাইটুলী, সাককাটুলী(সিক্কাটুলী), মাহুৎটুলী ইত্যাদি।

১৭৯৩ইং এর চিরস্থায়ী বন্দবাস্থের পর একএকটি পাড়া বা মহল্লা হয়ে উঠে ঐখানকার স্থায়ী গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নামে, যেমন আগা নওয়াব দেউরি, আলী নেকির দেঊরী, আগা সাদেক রোড, আগা মাসিলেন, সাতরোজা, মৌলভীবাজার ইত্যাদি।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, তখনকার মুঘল দরবারে সরকারী ভাষা ছিলো ফার্সী, কিন্তু প্রাদেশিক ভাষাও দলিলপত্র তে চালু ছিলো। যেমন সুবেহবাংলার প্রাদেশিক ভাষা ছিলো বাংলা।

তবে মুঘল বাদশাহ্‌ আকবারের আমলে সমগ্র উপমহাদেশ ভারত থেকে সকল প্রজাতি জাতি ধর্মের মানুষ সরকারী সৈন্যদলে যোগ দেওয়ার ফলে মুলত সংস্কৃত এবং ফার্সী ভাষার সমন্বয়ে উর্দু ভাষার উৎপত্তি হয়।

ছবি – ঢাকেশ্বরী মন্দির, ১৯০৪ সাল। (উইকিপিডিয়া)

তখন থেকে রাজধানী ঢাকায় বসবাসকারী সকল মুঘল উচ্চপদস্থ এবং নিম্নপদস্থ হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সকল পরিবারগুলোর মধ্যে উর্দু, হিন্দি, আরবী, তুর্কী এবং বাংলার মিশ্রণে নতুন এক চলিত ভাষার প্রচলন শুরু হয় যা কালের বিবর্তনে আজকের ঢাকাইয়া আদিবাসীদের ভাষা।

অন্যান্য প্রদেশেও এরকম মিশ্রিত চলিত ভাষার উৎপত্তি হয়েছে, যেমন মুম্বাইয়ের হিন্দি এবং মারাঠী মিশ্রণে মুম্বাইয়া ভাষা, দিল্লিতে হিন্দি এবং উর্দু মিশ্রণে দিল্লিওয়াল ভাষা ইত্যাদি ইত্যাদি।

ঢাকাইয়া আদিবাসীদের ভাষা অনেকটা উর্দু বা হিন্দির মতন শোনায়, তবে যারা ভাষা নিয়ে গবেষনা করেছেন তাদের মতে ঢাকাইয়া আদিবাসীদের ভাষায় শুধু ক্রিয়া এবং বিশেষণ গুলোই হছে উর্দু বা হিন্দি শব্দের বিক্রিত অংশ, একটা বাক্যের নামপদ বা বিশেষ্য বা সর্বনাম বা অন্যান্য পদ গুলো হচ্ছে বাংলায়। এই ঢাকাইয়া ভাষাকে “খোশবাস” অথবা “শোখবাস” বলে। বর্তমানে ঢাকাইয়া আদিবাসারা শোখবাস ভাষাকেই “শোব্বাসি” ভাষা বলে।

ছবি – আরমেনিয়ান চার্চ ,১৭৮১ সাল। (উইকিপিডিয়া)

১৮৫৭ইং সনে সিপাহী বিপ্লবে মুঘলদের শেষ বাদশাহ্‌ বাহাদুর শাহ্‌জাফর ইংরেজদের হাতে বন্দী হওয়ার আগে উর্দু ভাষা হঠাৎ করেই হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবার কাছেই উচ্চশ্রেনীর উচ্চবংশের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠে সমগ্র উপমহাদেশেই। যেটার প্রভাব সমগ্র বাংলাতেও পরে। আজও বাংলাদেশের বিভিন্ন বিলুপ্ত প্রায় জমিদার পরিবারগুলোর মাঝে উর্দুর কিছুটা কদর এবং প্রচলনও রয়েছে। সিলেট জমিদার ফ্যামিলি, বগুড়া জমিদার ফ্যামিলি, কুমিল্লা জমিদার ফ্যামিলি, টাঙ্গাইল জমিদার ফ্যামিলি, ঢাকার বিভিন্ন জমিদার পরিবার, বরিশাল এর জমিদার পরিবার ইত্যাদি ইত্যাদি প্রমান হিসাবে রয়েছে।

বংগভঙ্গের পর রাজনৈতিক ভাবে লাভবানের জন্য একশ্রেনীর অতিউৎসাহী নব্য রাজনৈতিকগণ উর্দু হচ্ছে মুসলমানদের ভাষা এবং বাংলা হচ্ছে হিন্দুদের ভাষা এই প্রচার করে খুবিই নোংরা রাজনৈতিক খেলা খেলেছেন। যেটার প্রভাব পাকিস্তান গঠনের পর দেখা যায়। এবং যারই প্রেক্ষাপটে মহান ভাষা আন্দোলন হয় ১৯৫২ সনে।

ঢাকাইয়া কুট্টি ভাষার উৎপত্তি শুর হয়, ১৯০৫ এ বংগভঙ্গের পর ঢাকার আসে পাশের সীমানা খাল এবং খোলা জমিগুলোতে আগের বছরের হয়ে যাওয়া দাঙ্গা, জলোচ্ছ্বাস এবং দুর্ভিক্ষের কারনে ঢাকার আশে পাশের গ্রামাঞ্চলের অনেক বাংলাভাষি সাধারন কৃষক পরিবার এসে আশ্রয় নেয়া শুরু করে এবং পরবর্তিতে তৎকালীন নবাব এবং সর্দার পরিবারদের সহোযগীতায় এরা বস্তী স্থাপন করে থাকা শুরু করে। এবং এদের প্রধান জীবিকা হয়ে দাঁড়ায় দিনমজুর অথবা ধান কুটানো। এদেরকে ঢাকার লোকজন কুট্টি ডাকতো। এই নব্য জনগোষ্ঠির সাথে প্রতিদিনের যোগাযোগ মাধ্যমের ফলে খোশবাস বা শোখবাস এর সাথে বাংলার মিশ্রণে শুরু হয় কুট্টি ভাষা। ১৯৫০ সনে হয়ে যাওয়া জমিদারী বিলুপ্ত আইনের কারনে এস্টেট একুয়েজেশন এক্ট (এসঃএঃ পর্চা) অনুযায়ী এই ভাসমান পরিবার গুলো ঐসকল স্থানের জমির মালিক হয়ে যায়। এবং এরাও ঢাকাইয়া হিসাবেই পরিচিতি পেতে থাকে। এবং সময়ের সাথে সাথে এই পরিবার গুলোর প্রচলিত ভাষাই হয়ে যায় আজকের ঢাকাইয়া কুট্টী ভাষা, এবং পরবর্তীতে খাল বিল বন্ধ হয়ে রাস্তাঘাট হয়ে যাওয়ায় জমির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় হঠাত করেই আস্তে আস্তে এই সকল কুট্টি পরিবার গুলো ব্যবসাবানিজ্যের মাধ্যমে বিরাট টাকা পয়সার মালিক হওয়া শুরু করে। এই ঢাকাইয়া কুট্টি ভাষা হচ্ছে বর্তমানে নাটক বা সিনেমাতে ঢাকাইয়া ভাষা হিসাবে প্রচলিত হয়ে আসছে। অথচ এইটা ঢাকাইয়া আদিবাসীদের ভাষা নয়। আদিবাসী ঢাকাইয়ারা পারিবারিক ভাবে নিজেদের মধ্যে শোব্বাসি বা খোশবাসি ভাষায় কথা বলেন যেটা অনেকেই নতুন শুনলে মনে করে উর্দু অথবা হিন্দি বলছে।

ছবি- লালবাগ কেল্লা

পাকিস্তান আমলে শেষ দিক পর্যন্ত এই ঢাকাইয়া আদিবাসী এবং ঢাকাইয়া কুট্টি দের মধ্যে অনেক বৈষম্য ছিলো। একে অপরের সাথে আত্মীয়তা পর্যন্ত হতো না। সময়ের সাথে সাথে এই বৈষম্য অনেকটাই আজকে শেষ হয়েছে, এখন প্রায় প্রতিটি পরিবারই আত্মীয়তা করছে। বরং বর্তমানে সকল ঢাকাইয়াদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব অনেক বেশী। আবার অনেক আদিবাসী ঢাকাইয়া পরিবারও সময়ের প্রবাহে এবং তৎকালীন উর্দু বাংলার রাজনীতির ঝড়ে এই ঢাকাইয়া শোব্বাসি ভাষায় কথা বলা পারিবারিক ভাবে বন্ধ করে ফেলেন বা প্রচলন রাখেন নি তারাও শুধু মাত্র কুট্টি ভাষায় এখন কথা বলেন।

এই মর্মে আরো বলতে চাই যে, ঢাকাইয়া আদিবাসীদের ভাষারও দুইভাগ আছে। একটা খোশবাস এবং শোব্বাস। খোশবাস এবং শোব্বাস এর তফাৎ খুবই কম। তবে যারা এই ভাষায় কথা বলে তারা এইটা বুঝতে পারে।

উচ্চবংশ বা সমাজের উঁচু শ্রেনীর ঢাকাইয়া আদিবাসী বা যাদেরকে আশ্রাফ-ঢাকাইয়া বলা হতো যেমন জমিদার, হাকিম, মাষ্টার, মৌলভী, সরকারী নবাবী দরবারের কর্মচারী দারোগা বা কোর্টএর পেশকার উকিল শ্রেনী যারা ছিলেন তারা অর্থাৎ শিক্ষিত শ্রেনীর পরিবারগুলো এই খোশবাস ভাষায় কথা বলতেন বা এখনো বলেন।

এবং ততকালীন নিম্ন আয়ের ঢাকাইয়া আদিবাসী শ্রেনীর পরিবারগুলো যেমন কসাই, হাজ্জাম (নাপিত), মাছুয়া (জেলে), মাহুত, গোরখোর(কবরখোর), সাক্কা (পানিওয়ালা), হাজ্জাম (নাপিত), লাঠিয়াল, এক্কাওয়ালা (ঘোড়াগাড়ীওয়ালা) আরো বিভিন্ন নিম্ন শ্রেনীর পেশার পরিবার গুলো শোব্বাস ভাষায় কথা বলতেন বা এখনো বলেন।শোব্বাশ বা খোশবাস এর কোনো পার্থক্য নাই শুধু ভদ্রতা সুচক শব্দগুলোর ব্যবহারেই পার্থক্য।

জমিদারী বিলুপ্তির কারনে, এখন সমাজে অনেক উঁচুবংশের পরিবার গুলো জমিদারী হারিয়ে আজকে সব ধরনের পেশা ধরেছেন, আবার অনেক সাধারন পেশার পরিবার গুলো ব্যবসাবাণিজ্যের মাধ্যমে নিজের ভাগ্যের পরিবর্তন করে উচ্চবিত্তে পরিণত হয়েছেন। তাই এই খোশবাস বা শোব্বাস ভাষার পার্থক্য এখন বোঝা মুস্কিল। তবে কিছু কিছু পরিবার এখনো তাদের সামাজিক আত্মীয়তা বিবাহ যোগে শুধুমাত্র ধর্ম বা পরিবার কেন্দ্রিক করেছেন অর্থাৎ নিজের গুষ্টির বাইরে বিয়েশাদী করে না তারা এই খোশবাস বা শোব্বাস গুলোর পার্থক্য ধরতে পারেন বা লক্ষ করেন।

যেমন ঢাকাইয়া আদিবাসীদের মধ্যে সুফীমতবাদ, চিশতীমতবাদ অথবা কাদরীমতবাদ অর্থাৎ ঢাকার ভেতরের মাজার কেন্দ্রিক পরিবার গুলো বা শিয়া ধর্মের মতবাদ পরিবার গুলো বা ঢাকা নওয়াব পরিবারের খাজা বংশের পরিবারগুলো এখনো খোশবাস ভাষায় কথা বলে থাকেন।

যেমনঃ

বাংলায়ঃ “ও মিয়া তুমি কোথায় যাচ্ছ?
উত্তরঃ কেন? আমি বাসায়/ ঘরে / বাড়ীতে যাচ্ছি। আমাদের বাসায় তোমাদের দাওয়াত।”
বা “ওকি এসেছিলো”? ও কি গিয়েছিলো?

­­­

ঢাকাইয়া কুট্টিঃ “ ঐ বেটা কৈ জাই তাছো ?
উত্তরঃ “কেলা? বাসায় (BaasSai) জাইতাছি। আমগো বাসায় তোমগো দাওয়াত”।
বা “ও কি আইছিলো? বা ও কি গেছিলো”?

ঢাকাইয়া খোশবাসঃ “ও সাব কাহা যারাহেঁ?
উত্তরঃ “কায়? হাম ঘার যা রাহে। হামলোককা ঘারমে তোমলোগকা দাওয়াত।”
বা “ঊ কিয়া আয়াথা? বা ঊ কিয়া গায়াথা”?

ঢাকাইয়া শোব্বাসঃ “ও মিয়া কাহা যারাহো?
উত্তরঃ “কায়? ম্যায় বাড়ী যা রাহে। হামোকা বাড়ীমে তোমোকা দাওয়াত।”
বা “ঊ কিয়া আইসথা? বা ঊ কিয়া গাইসথা”?

এই তফাৎ সাধারণ মানুষের জানা না থাকার অনেক কারন আছে। ১৯৪৭ এ দেশ ভাগ এর পর অনেক ঢাকাইয়া পরিবার গুলোই বিহারি বা দিল্লিওয়াল অথবা পাঞ্জাবি পরিবারের সাথে আত্মীয়তা করে আবার দেশ স্মাধীন এর পর অনেক কুট্টি পরিবার গুলো বিহারী অথবা ঢাকাইয়া পরিবার গুলোর সাথে আত্মীয়তা করে, ফলে মুল আদি ঢাকাইয়া এবং তাদের ভাষা এবং ভাষার ইতিহাস প্রায় বিলুপ্তির পথে।

এখানে একটা বিষয় লক্ষনীয়, কিছু কিছু ঢাকাইয়া কুট্টি পরিবারগুলো ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এলাকার বাংলাভাষী পরিবার গুলোর সাথে আত্মীয়তার কারনে একটা অপপ্রচার চালায় যে যারা ঢাকাইয়া শোববাস বা ঢাকাইয়া খোশবাস ভাষায় কথা বলে তারা বিহারী বা পাকিস্তানী। এটা অনেক অপমানজনক।এবং অনেক ঢাকাইয়া আদিবাসীরা নিজেদের ভাষার এবং জাতিগত ইতিহাস না জানার কারনে এইরকম কথার উত্তর দিতে পারে না।

পক্ষান্তরে ১৯৫২ সনের ভাষা আন্দোলনে কয়েকটা মুস্লীমলীগ পরিবার গুলো বাদে সব ঢাকাইয়া আদিবাসী পরিবার গুলো বাংলা ভাষার প্রতি সমর্থন জানায়। প্রমান হিসাবে ঢাকার সব সরদার পরিবার কিছু জমিদার পরিবার গুলোর ইতিহাস পড়লেই জানা যায়। এবং বঙ্গবন্ধু ইনাদের অনেক কদর এবং সমীহ সম্মান করতেন।

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের কারনে ঢাকা শহরে আসা বিহারী উর্দু বা হিন্দি ভাষী পরিবার গুলোর সাথে এই ঢাকাইয়া আদিবাসীদের তুলনা করা নিজেদের মুর্খতার প্রমান দেয়া ছাড়া আর কিছু নয়।

এক্টা উদাহরণ হিসাবে যদি বলি, বর্তমানে ‘গুলশান’ এলাকার পরিবার গুলো একটা বিশেষ এক্সেন্টে কথা বলে। মিডিয়া তে এই ভাষাকে ‘বাংলিশ’ বলে হাসিঠাট্টা করা হয়। এখন বাড্ডা বা নর্দ্দা বা কালাচাদপুর এলাকার বাসিন্দারা নিজেকে যতই গুলশান বাসি বলুক অথবা তারা যতই বাংলিশ উচ্চারনে কথা বলুক তারা কখনই গুলশানবাসি না। আদি গুলশান বলতেই বুঝাবে যারা গুলশান প্রতিষ্ঠার কালে প্লট বরাদ্দ পেয়েছিলেন সেই পরিবার গুলো। পরবর্তীতে যতই সবাই ফ্ল্যাট অথবা জমি কিনে গুলশানে ঢুকেছেন তারা আদিগুলশান বাসি না। আমি ইতিহাস লেখিনি উপস্থাপন করছি মাত্র।

এখন আসেন আবার আদিবাসী ঢাকাইয়ার খোশবাস বা শোব্বাস ভাষায়, সাভার মিরপুর বা মগবাজার মতিঝিল এর আশেপাশের এলাকার মোঘল আমল থেকে থাকা আদিবাসিন্দারাও একটা সময় পর্যন্ত ঢাকাইয়া খোশবাস ভাষায় কথা বলতেন। দেশভাগের পর থেকে এই সকল অনেক পরিবারগুলো আস্তে আস্তে এই ভাষায় কথা বলা ছেড়ে দিয়েছন। উদাহরণ হিসাবে বেশকিছু সর্দার মৌলভী অথবা মাজার কেন্দ্রিক ঐতিহাসিক পরিবার গুলো প্রমান। তারা এখন আর খোশবাস বা শোব্বাস ভাষায় কথা বলেন না তারা এখন শুধু কুট্টি ভাষায় কথা বলেন।

পরিশেষে বলতে চাই, সিলেটের চলিত সিলটি ভাষা যেমন শুনতে আসাম প্রদেশের ভাষার মতন কিন্তু এটা বাংলারই একটা রুপ, চট্টগ্রামের চাটগাইয়া ভাষা, নোয়াখালীর নোয়াখাইল্লা ভাষা, বরিশালের বরিশাইল্লা ভাষা যেভাবে বাংলারই একটা রুপ সেভাবেই , ঢাকাইয়া আদিবাসীদের উর্দু বা হিন্দির মতন শোনায় এই ভাষাটাও বাংলা এবং উর্দুর মিশ্রনে ঢাকাইয়া খোশবাস বা শোব্বাস ভাষায় পরিনত হয়েছে এবং এটা বাংলারই একটা রুপ। এবং একজন আদিবাসী ঢাকাইয়া হিসাবে আমি এই ভাষায় কথা বলতে পেরে গর্ববোধ করি।

( উপরের কথাগুলো থেকে কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা বা কাউকে নিচু শ্রেনী বলে অপমান করা উদ্দেশ্য নয়, বরং আমি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকেই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।)

রেফারেন্স হিসাবে বই গুলো পড়তে পারেন
১। মুনশী রাহমান আলী তায়েশ এর “তাওয়ারীখ এ ঢাকা”
২। রফিকুল ইসলামের “ঢাকাইয়া উর্দু সংস্কৃতি”
৩। হাকিম হাবিবুর রাহমানের “ঢাকা পাচাস বারাস পেহলে”
৪। নাজির হোসাইন এর “কিংবদন্তির ঢাকা”
৫। আহমেদ হোসাইন দানীর “ The History of Dhaka”
৬। “বাঙ্গাল পে উর্দু” ডঃ কানিজ ই বাতুল ঢাকা বিশ্বঃ

লেখক পরিচিতিঃ

সৈয়দ আহমেদ আলী, পুরানো শহর থেকে ব্যবসায়ী। তাঁর বাবা সৈয়দ তাকী মোহাম্মদ যিনি বুদ্দান নবাব নামেও পরিচিত। তাঁর দাদা পুরান ঢাকার ছোট্টান নবাব যিনি পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে তিনি অত্যন্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
এক কথায় জনাব আলী পুরান ঢাকার এক অতি প্রাচীন ও অভিজাত পরিবারের একজন সদস্য এবং তিনি তাদের পারিবারিক বাড়িতে থাকেন যা মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়ে নির্মিত হয়েছিল।

 

.

খবরটি শেয়ার করুন..




© All rights reserved © 2020 onusondhan24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!