শনিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২১, ০৭:৪৭ অপরাহ্ন

গনস্বাস্থ্যের “করোনা কিট” : প্রত্যাশা, হতাশা এবং বাস্তবতা

গনস্বাস্থ্যের “করোনা কিট” : প্রত্যাশা, হতাশা এবং বাস্তবতা

ড. রুবায়েত হাসান তানভী পিএইচডি, এফসিসিএম, ডি(এবিবিএম)

অবশেষে বিএসএমএমইউ বহুলালোচিত গণস্বাস্থ্যের কিট নিয়ে তাদের ইভালুয়েশন রিপোর্ট প্রকাশ করলো। সেই মার্চ মাস থেকে এই টেস্ট কিট নিয়ে যেসব আশংকার কথা বলে আসছিলাম এখন তাই প্রমাণিত হলো। কিন্তু না এই ইভালুয়েশন রিপোর্ট নিয়ে মোটেই উৎফুল্ল নই বরং আমার ধারণাগুলো ভুল প্রমাণিত হলেই বরং খুশি হতাম, অন্তত এই বিপর্যয়ের সময় দেশে তৈরী এই কিট মানুষের কাজে লাগতো। শুরু থেকেই বলে আসছি সমস্যাটা শুধু কিটের গুনাগুন বিচারে নয় বরং সমস্যাটা মূল কনসেপ্টএ, সমস্যাটা টেস্ট কিটটি নিয়ে অতি প্রত্যাশায়। সবচেয়ে বড় ভুল ছিলো শুরু থেকেই এই টেস্ট কিটটাকে আরটি-পিসিআর এর বিকল্প হিসেবে প্রমোট করার চেষ্টায়। অথচ যার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। এই মহামারী মোকাবেলায় আরটি-পিসিআর এর পাশাপাশি এন্টিবডি টেস্টের গুরুত্ব ও কিন্তু কম নয়। শুধু এন্টিবডি টেস্ট হিসেবে ডেভেলপ করে, রোগের ডায়াগনোসিস এই টেস্টের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিয়েই, এর নানা রকম উপযোগিতা বিচারে প্রমোট করা যেত। ইতিমধ্যে বিশ্বের বাঘা বাঘা এন্টিবডি টেস্ট কোম্পানি গুলো তাদের প্রোডাক্ট বাজারে ছেড়ে দিয়েছে: যার মধ্যে আছে ল্যাবে যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে করার মতো টেস্ট যেমন এলাইজা টেস্ট বা ইআইএ টেস্ট , আবার ঘরে নিজে নিজে করার মতো ল্যাটারাল ফ্লো টেস্ট। কোম্পানি প্রকাশিত তথ্যে বা বিভিন্ন গবেষণা পত্রে এসব টেস্ট এর ভ্যালিডেশন ডাটা যদি পর্যালোচনা করা হয় তাহলে কিন্তু একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ রোগের উপসর্গ দেখা দেবার পর থেকে ১০ দিন বা দু সপ্তাহের মধ্যে টেস্ট করলে টেস্টের সেনসিটিভিটি অনেক কম আসছে। টেস্ট রেজাল্ট এ অনেক তারতম্য দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে দুসপ্তাহ পরে টেস্ট করলে এসব টেস্টএর সেনসিটিভিটি শতকরা আশি থেকে একশভাগ পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে।

অন্যদিকে গণস্বাস্থ্যের টেস্ট নিয়ে পরিকল্পনায় আরেকটি বড়ো ভুল ছিল এন্টিজেন টেস্ট এর দিকে ফোকাস করা। প্রথমে তারা রক্তে এন্টিজেন টেস্ট করার মত উদ্ভট চিন্তা করলো এমন একটা ভাইরাসের জন্য যা রক্তে নয় বরং শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ ঘটায়। আর রক্তে এই ভাইরাস কতটুকু পাওয়া যায় তার কোনো পরীক্ষিত তথ্য ছাড়াই একটা ইন্টারভিউ তে ড: বিজন বললেন রক্তে অনেক ভাইরাস থাকে। অবশ্য এই ভুল ভাঙতে নিশ্চই খুব বেশি সময় লাগেনি, কারণ এরপর তারা লালা তে এন্টিজেন টেস্ট করার চেষ্টা শুরু করেন সম্ভবত তাই ব্যর্থ হয়। এটা অস্বাভাবিক নয় কারণ এটা সুপ্রতিষ্ঠিত যে এন্টিজেন টেস্ট আরটি পিসিআর এর তুলনায় অনেক কম সেনসিটিভ। সেক্ষেত্রে এন্টিজেন টেস্ট থেকে আরটি পিসিআর এর সমান না হলেও, সেনসিটিভিটি গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে নিয়ে আসতে প্রয়োজন সঠিক স্যাম্পল ব্যবহার করা এবং বিশেষ ধরণে ডিটেক্টশন কেমিস্ট্রি ব্যবহার করা যাতে সিগন্যাল অনেক বেড়ে যায় , আর যা জি ব্লট এর মতো পয়েন্ট অফ কেয়ার ডিভাইস দিয়ে সম্ভব নয়। এখন পর্যন্ত সফল ভাবে এন্টিজেন টেস্ট তৈরী করতে সক্ষম হয়েছে বিশ্বের নামকরা ডায়াগনস্টিক কোম্পানি কুইডেল। এফডিএ এপ্রুভাল ও পেয়েছে। কিন্তু তারা ব্যবহার করছে আরটি পিসিআর এর মতো শ্বাসতন্ত্রীয় নমুনা এবং বিশেষ ধরণের ফ্লোরেসেন্ট টেকনোলজি যা তাদের বিশেষ মেশিনে দিয়ে সনাক্ত করা হয়। এন্টিজেন টেস্টের সেনসিটিভিটি আরটিপিসিএর এর কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারলে তা রোগের ডায়াগনোসিসে আরটি পিসিআর এর বিকল্প হয়ে পারে।

কিন্তু এর মানে এই না যে এন্টিবডি টেস্ট এর প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশে এখন মহামারি এমন পর্যায়ে চলে গেছে , এখন কার ইনফেকশন হয়েছে সেটা জানা যেমন জরুরি , তেমনি কার ইনফেকশন হয়ে ভালো হয়ে গেছে সেটা জানাও একান্ত জরুরি। অনেকেই ইনফেকশন হবার পরও উপসর্গহীন থাকছেন বা হালকা উপসর্গে ভুগছেন। এদের অনেকেই আরটি পিসিআর এর ঝামেলায় যাচ্ছেন না বা দেরি করে যাচ্ছেন , যার ফলে টেস্ট নেগেটিভ আসছে। এসব মানুষ কোনোভাবেই নিশ্চিত হতে পারছেন না তাদের করোনা রোগ হয়েছে কি হয় নি। অথচ হাতের কাছে এন্টিবডি টেস্ট করার ব্যবস্থা থাকলে খুব সহজেই পরীক্ষা করে নিতে পারতেন। টেস্ট নেগেটিভ আসলে দুয়েক সপ্তাহ পরে আবারো টেস্ট করে নিশ্চিত হতে পারতেন। এক্ষেত্রে এন্টিবডি টেস্ট নেগেটিভ আসলে এসব মানুষ নিশ্চিন্তে কাজে ফিরে যেতে পারতেন। লকডাউনে আটকে থাকতে হতোনা। এই ব্যাপারগুলো আরো বেশি জরুরি ডাক্তার নার্স সহ স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত সব মানুষের। যাদের শরীরে এন্টিবডি ডেভেলপ হয়ে গেছে তারা কাজে ফিরে যেতে পারতেন নির্ভয়ে। এসব ছাড়াও এন্টিবডি টেস্টের রয়েছে আরো অনেক উপযোগিতা যেমন কমিউনিটি স্ক্রীনিং , প্লাজমা থেরাপির জন্য ডোনার স্ক্রীনিং বা আক্রান্ত রোগীকে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেবার আগে স্ক্রীনিং।

বিএসএমএমইউ এর রিপোর্টে বলা হয়েছে গণস্বাস্থ্যের কিট দিয়ে কোনো রোগীর আগে ইনফেকশন হয়েছিল কিনা তা এন্টিবডি টেস্ট করার মাধ্যমে ৭০ ভাগ পর্যন্ত সনাক্ত করা যাচ্ছে। গণস্বাস্থ্যের উচিত এই তথ্যের উপর ভিত্তি করে কিভাবে তাদের টেস্টের সেনসিটিভিটি আরেকটু বাড়ানো যায় তা চিন্তা করা। আর একই সাথে সরকারের উচিত এনিয়ে অযথা কালক্ষেপন না করে বিদেশ থেকে বিভিন্ন ফরমেট এর এন্টিবডি টেস্ট নিয়ে এসে ইভালুয়েশন শুরু করা। বাংলাদেশের অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার এ বিভিন্ন কোম্পানির অটোমেটেড সেরোলজিক্যাল মেশিন আছে যেমন Abbott, Bio-Rad, Diasorin, Euroimmun, Quidel ও Roche এর মতো নামকরা কোম্পানি । এসব কোম্পানির করোনাভাইরাসের এন্টিবডি কিট ইতিমধ্যে বাজারজাতকরণ শুরু হয়ে গেছে। এর পাশাপাশি , গবেষণা তথ্য যাচাই করে রেপিড এন্টিবডি টেস্ট কিটও নিয়ে আশা প্রয়োজন। কুইডেল এর মতো ভালো মানের এন্টিজেন টেস্ট ও তা টেস্ট করার মেশিন নিয়ে আসতে পারলে সেটাও কাজে লাগবে অনেক আরটি পিসিআর এর পাশাপাশি।

গণস্বাস্থ্যের কিট নিয়ে বিজ্ঞান সম্মত আলোচনা বাদ দিয়ে আবেগ , ব্যক্তিত্ব ও রাজনীতি টেনে এনে বিতর্কে সময় নষ্ট হয়েছে অনেক। তাতে কারো জয় লাভ হয়নি। অথচ পরাজিত হয়েছে বাংলাদেশ। ঠিক যেসময় এধরণের টেস্ট এর প্রয়োজন ছিল হাতের কাছে কিছুই মিলছে না। আক্রান্তের সংখ্যা আর মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে প্রতিদিন সর্বোচ্চ হারে। এসময় নীতিনির্ধারকদের শুভবুদ্ধির উদয় হউক এই প্রত্যাশা ছাড়া আর কোনো আশা দেখছি না।


লেখক পরিচিতিঃ

ড. রুবায়েত হাসান তানভী পিএইচডি, এফসিসিএম, ডি(এবিবিএম)
সহকারী অধ্যাপক, ক্লিনিকাল প্যাথলজী এন্ড ল্যাবরেটরী মেডিসিন,
ওয়েইল কর্নেল মেডিকেল কলেজ,কাতার।
ক্লিনিকাল মলিকুলার মাইক্রোবায়োলজিস্ট, ডিপার্টমেন্ট অব প্যাথলজি, সিদরা মেডিসিন, কাতার
(কাতারে কর্মরত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভাইরলজিস্ট)

 

 

.

খবরটি শেয়ার করুন..




© All rights reserved © 2020 onusondhan24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!