সারারাত চার্জে ফোন, ক্ষতি কতটা?

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ফোন চার্জে বসিয়ে সকালে উঠে খোলা—এটি এখন অনেকের কাছেই এক ধরনের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তবে ব্যাটারি শতভাগ চার্জ হয়ে যাওয়ার পরও যদি ফোনটি দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ সংযোগে লাগানো থাকে, তাহলে এতে ব্যাটারির কোনো ক্ষতি হয় কি না—এ নিয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের কৌতূহল রয়েছে। প্রযুক্তিবিদদের মতে, আধুনিক স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নের উত্তর আগের ধারণার চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন।

বর্তমান সময়ের স্মার্টফোনগুলোতে সাধারণত লিথিয়াম-আয়ন বা লিথিয়াম-পলিমার প্রযুক্তির ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়। ফোন পুরোপুরি চার্জ হয়ে গেলে এর অভ্যন্তরীণ চার্জিং ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ প্রবাহ কমিয়ে দেয় কিংবা মূল চার্জিং প্রক্রিয়া থামিয়ে দেয়। এ কারণে শতভাগে পৌঁছানোর পরও ব্যাটারিতে একটানা বিদ্যুৎ প্রবেশ করতে থাকে না। ফলে সারারাত চার্জে রাখলেই ফোন ‘ওভারচার্জ’ হয়ে নষ্ট হয়ে যাবে—এই প্রচলিত ধারণাটি প্রযুক্তিগতভাবে সঠিক নয়।

দীর্ঘসময় শতভাগ চার্জে থাকা কতটা নিরাপদ

যদিও সরাসরি ওভারচার্জ হওয়ার ঝুঁকি কম, তবু দীর্ঘ সময় ব্যাটারিকে শতভাগ চার্জ অবস্থায় রেখে দেওয়া আদর্শ চর্চা নয়। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, লিথিয়াম-নির্ভর ব্যাটারিতে দীর্ঘসময় পূর্ণ চার্জ ধরে রাখলে ভেতরে ধীরগতির রাসায়নিক অবক্ষয় প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হতে পারে, যার প্রভাব পড়ে ব্যাটারির সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতার ওপর। এ কারণে কয়েক মাস বা বছর পর অনেকেই লক্ষ করেন, আগের তুলনায় ফোনের চার্জ অনেক দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ রাতভর চার্জিংয়ের প্রকৃত ঝুঁকি তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণ বা ওভারচার্জ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে ব্যাটারির কর্মক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যাওয়া।

তাপমাত্রার দিকেও নজর রাখা জরুরি

ব্যাটারির স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। চার্জ দেওয়ার সময় ফোন সামান্য গরম হওয়া স্বাভাবিক হলেও অতিরিক্ত তাপ ব্যাটারির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, বালিশ, কম্বল কিংবা বিছানার নিচে রেখে ফোন চার্জ না করার। কারণ এসব স্থানে বাতাস চলাচল সীমিত থাকায় উৎপন্ন তাপ সহজে বের হতে পারে না। চার্জের সময় ফোনকে শক্ত, সমতল ও উন্মুক্ত স্থানে রাখাই তুলনামূলক নিরাপদ।

ব্যাটারি সুরক্ষা ফিচারের সুবিধা নিন

ব্যাটারির আয়ু দীর্ঘায়িত করতে বর্তমানে অধিকাংশ স্মার্টফোন নির্মাতা বিশেষ চার্জিং প্রযুক্তি যুক্ত করছে, যা মডেলভেদে অপটিমাইজড চার্জিং, অ্যাডাপটিভ চার্জিং বা ব্যাটারি প্রোটেকশন নামে পরিচিত। এসব ফিচার ব্যবহারকারীর চার্জিং অভ্যাস বিশ্লেষণ করে ফোনকে দীর্ঘসময় শতভাগ চার্জে আটকে না রেখে নির্দিষ্ট সময়ের কাছাকাছি গিয়ে সম্পূর্ণ চার্জ করে, যার ফলে ব্যাটারির ওপর চাপ কমে।

সংক্ষেপে ব্যাটারি ভালো রাখার উপায়

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, চার্জের সময় ফোন খোলা ও বাতাস চলাচলযুক্ত স্থানে রাখা, অতিরিক্ত গরম হলে সাময়িকভাবে ব্যবহার বন্ধ রাখা, মানসম্মত চার্জার ও কেবল ব্যবহার করা এবং ফোনে থাকা ব্যাটারি প্রোটেকশন বা অপটিমাইজড চার্জিং সুবিধা সক্রিয় রাখাই ব্যাটারির দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিতের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, স্মার্টফোনের ব্যাটারি মূলত একটি ক্ষয়যোগ্য উপাদান, যত্ন নেওয়া হলেও সময়ের সঙ্গে এর সক্ষমতা কিছুটা কমবেই। শুধু রাতভর চার্জে রাখার কারণেই ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যায়—এই ধারণা সঠিক নয়; বরং তাপমাত্রা, ব্যবহারের ধরন এবং ব্যাটারির বয়স—এই সব কিছু মিলিয়েই নির্ধারিত হয় একটি ব্যাটারির প্রকৃত স্থায়িত্ব।

ত/জু