একজন উদ্ভিদ রোগতত্ত্ববিদের দৃষ্টিতে
ফসলের রোগ ও পোকামাকড় দমনে কীটনাশক আজও কৃষকের প্রধান ভরসা। কিন্তু এই একই রাসায়নিক যে কৃষকের নিজের শরীরের জন্য নীরব ঘাতক হয়ে উঠতে পারে, সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক গবেষণা সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি কৃষক ও কৃষিশ্রমিক প্রতি বছর অনিচ্ছাকৃত তীব্র কীটনাশক বিষক্রিয়ার শিকার হচ্ছেন। দক্ষিণ এশিয়া এই তালিকায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর অন্যতম। একজন উদ্ভিদ রোগতত্ত্ববিদ হিসেবে দীর্ঘদিন ফসলের রোগ নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এই সংকটের সমাধান কেবল কীটনাশক নিষিদ্ধ করার মধ্যে নেই— সমাধান নিহিত আছে বিজ্ঞানসম্মত, সুসংহত কৃষি চর্চার (Good Agricultural Practices বা GAP) ব্যাপক প্রয়োগে।
গবেষণার হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের প্রায় অর্ধেক কৃষক ও কৃষিশ্রমিক প্রতি বছর কোনো না কোনো মাত্রায় কীটনাশকের বিষক্রিয়ার মুখোমুখি হচ্ছেন। মৃত্যুর সংখ্যাও নেহাত কম নয়। কৃষিনির্ভর দেশগুলোর অবস্থান বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। তার ওপর আছে অনথিভুক্ত ঘটনার এক বিশাল ছায়া। প্রত্যন্ত এলাকায় চিকিৎসাসুবিধার অভাব, উপসর্গকে সাধারণ অসুস্থতা ভেবে উপেক্ষা করা, এবং চিকিৎসকদের মধ্যে কীটনাশকজনিত বিষক্রিয়া শনাক্তকরণে প্রশিক্ষণের ঘাটতি। সব মিলিয়ে প্রকৃত চিত্র সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়েও ভয়াবহ।
সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এসেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)। ২০৩৫ সালের মধ্যে অত্যন্ত বিপজ্জনক কীটনাশক ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের আন্তর্জাতিক লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। যা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় একটি পদক্ষেপ। বাস্তবতা হলো, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না যতক্ষণ না কৃষকের হাতে বিকল্প তুলে দেয়া যাবে। বহু ক্ষেত্রে কৃষক জানেনই না কোন রোগ বা পোকার আক্রমণে ঠিক কতটুকু, কোন সময়ে, কোন মাত্রায় রাসায়নিক প্রয়োগ প্রয়োজন। ফলাফল— অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। যা একদিকে ফসলের খরচ বাড়ায়। অন্যদিকে কৃষকের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এখানেই GAP-এর গুরুত্ব। সুসংহত কৃষি চর্চার মূল ভিত্তি হলো রোগ ও পোকা সঠিকভাবে শনাক্ত করা, প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (Integrated Pest Management বা IPM) অনুসরণ করা, এবং রাসায়নিক প্রয়োগকে শেষ বিকল্প হিসেবে রাখা। প্রথম বিকল্প নয়। আর গ্যাপ নীতিমালায় নিজেকে সুরক্ষিত রাখা। করনীয় রোগ প্রতিরোধী জাত নির্বাচন, ফসল আবর্তন, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ, জৈবিক দমন পদ্ধতি এবং সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণে রাসায়নিক প্রয়োগের প্রশিক্ষণ। সবকিছু সমন্বয় করে কৃষিকাজ করলে টেকসই কৃষির সাথে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিৎ হবে। কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা অনেকাংশে কমে আসবে।
তবে তাত্ত্বিক জ্ঞান আর মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন।গরম আবহাওয়ায় সুরক্ষা পোশাক পরে দীর্ঘ সময় কাজ করা অস্বস্তিকর, ব্যয়বহুল সুরক্ষা সরঞ্জাম অনেক কৃষকের নাগালের বাইরে, আর প্রশিক্ষণের সুযোগও সীমিত। তাই কেবল “নিরাপদে কীটনাশক ব্যবহার করুন” বলাটুকু যথেষ্ট নয়— প্রয়োজন এমন একটি কৃষি ব্যবস্থা যেখানে কীটনাশকের প্রয়োজনীয়তাই কমে আসে। রোগ নির্ণয়ে দক্ষতা অর্জন, স্থানীয় ভাষায় সহজবোধ্য প্রশিক্ষণ উপকরণ তৈরি এবং কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীদের মাধ্যমে ক্রমাগত পরামর্শ সেবা— এই তিনটি স্তম্ভ ছাড়া GAP বাস্তবায়ন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
মানবিক দৃষিাটকোনে কৃষকের স্বাস্থ্যরক্ষা একটি মৌলিক অধিকার প্রশ্ন। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য যে হাত মাঠে শ্রম দেয়, সেই হাতের সুরক্ষাও নিশ্চিত করা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। এই লক্ষ্যে প্রয়োজন—
- স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা ও GAP বিষয়ক প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ
- অত্যন্ত বিপজ্জনক কীটনাশকের বিকল্প হিসেবে নিরাপদ ও জৈবিক পদ্ধতির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা
- স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে কীটনাশক বিষক্রিয়া শনাক্তকরণ ও নথিভুক্তকরণে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ
- কৃষক পর্যায়ে সুরক্ষা সরঞ্জাম সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করা
FAO-এর ২০৩৫ সালের লক্ষ্য একটি দিকনির্দেশনা মাত্র; প্রকৃত পরিবর্তন আসবে মাঠপর্যায়ে, যখন কৃষক জানবেন কখন ও কতটুকু রাসায়নিক প্রয়োজন। বিজ্ঞান আর মাঠের অভিজ্ঞতার এই সমন্বয়ই পারে কৃষকের জীবন ও জীবিকা— দুটোকেই একসঙ্গে রক্ষা করতে।






