কোয়ান্টাম কম্পিউটিং: নতুন প্রযুক্তির যুগে নতুন ক্যারিয়ারের হাতছানি

চাহিদা বাড়ছে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এর। সাথে বাড়ছে পেশাগত চাহিদা। পেশাগত দক্ষতা বৃাদ্ধর জন্য জেনে নেয়া যাক পৃথিবীর কোথায়, কিভাবে পড়াশুনা করতে হবে।

কম্পিউটারের ক্ষমতাকে আরও দ্রুত এবং জটিল সমস্যার সমাধানের দিকে নিয়ে যেতে বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব বাড়ছে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এর। প্রচলিত কম্পিউটারের বিট-এর বদলে কোয়ান্টাম কম্পিউটারে কিউবিট ব্যবহার করা হয়। কোয়ান্টাম মেকানিক্স-এর বিভিন্ন নীতি কাজে লাগিয়ে তৈরি এই প্রযুক্তি।

ভবিষ্যতে ক্রিপ্টোগ্রাফি, ওষুধের গবেষণা, অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উপাদানবিজ্ঞান এবং অপ্টিমাইজ়েশন-এর মতো ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, চীন, কানাডা, জাপান, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারত-সহ বিশ্বের বহু দেশ এই ক্ষেত্রে গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির উপর জোর দিচ্ছে।

কী পড়তে হয়?

কোয়ান্টাম কম্পিউটিং নিয়ে পড়াশোনার ক্ষেত্রে পদার্থবিদ্যা, গণিত, কম্পিউটার সায়েন্স এবং ইলেকট্রনিক্স-এর পড়াশোনা থাকা প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষায় সাধারণত কোয়ান্টাম মেকানিক্স, কোয়ান্টাম ইনফরমেশন, কোয়ান্টাম অ্যালগরিদম, কোয়ান্টাম কমিউনিকেশন, ক্রিপ্টোগ্রাফি, কোয়ান্টাম মেশিন লার্নিং, কম্পিউটেশনাল পদ্ধতি এবং প্রোগ্রামিং-সহ আরও নানা বিষয় শেখানো হয়।

শুধু এই নয়, বর্তমানে কোয়ান্টাম সফটওয়্যার, সিমুলেটর এবং ক্লাউড ভিত্তিক কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যার নিয়েও কাজ শেখার সুযোগ রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি সংস্থার সার্টিফিকেট প্রোগ্রামেও পাইথন, কিউআইএসকিট (Qiskit), ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের সমন্বিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।

কী যোগ্যতা প্রয়োজন?

কোয়ান্টাম কম্পিউটিং পড়ার জন্য একটিই নির্দিষ্ট শিক্ষাগত পথ নেই। বিজ্ঞান নিয়ে উচ্চমাধ্যমিকের পর পদার্থবিদ্যা, গণিত, কম্পিউটার সায়েন্স, ইলেকট্রনিক্স বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক স্তরে পড়াশোনা করে পরে কোয়ান্টাম টেকনোলজি-তে স্পেশ্যালাইজ়েশন করা যায়।

ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়ারাও এই ক্ষেত্রে যেতে পারেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কোয়ান্টাম টেকনোলজিতে মাইনর, সার্টিফিকেট এবং স্নাতকোত্তর পাঠক্রম তৈরি করা হয়েছে। ফলে মূল বিষয়ের পাশাপাশি কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে বিশেষ দক্ষতা অর্জনের সুযোগ ক্রমেই বাড়ছে।

গণিত ও পদার্থবিদ্যার ভিত শক্ত হলে সুবিধা হয়। পাশাপাশি পাইথন-এর মতো প্রোগ্রামিং ভাষা, অ্যালগরিদম এবং মেশিন লার্নিং সম্পর্কে ধারণা থাকলে এই ক্ষেত্রে এগোনো সহজ হতে পারে।

বিশ্বের কোন কোন প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা ও গবেষণার সুযোগ?

যুক্তরাষ্ট্র: এমআইটি, ক্যালটেক, স্ট্যানফোর্ড, হার্ভার্ড, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়, প্রিন্সটন, ইউসি বার্কলে এবং মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ান্টাম ইনফরমেশন সায়েন্সে শক্তিশালী গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। আইবিএম, গুগল, মাইক্রোসফট এবং অ্যামাজনের মতো প্রযুক্তি সংস্থাগুলিও নিজস্ব কোয়ান্টাম গবেষণা দল ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালায়।

কানাডা: ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর কোয়ান্টাম কম্পিউটিং (IQC) এবং পেরিমিটার ইনস্টিটিউট ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স বিশ্বখ্যাত গবেষণাকেন্দ্র।

ইউরোপ: নেদারল্যান্ডসের ডেলফট বিশ্ববিদ্যালয় (QuTech), সুইজারল্যান্ডের ইটিএইচ জুরিখ, জার্মানির মিউনিখ কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট, ব্রিটেনের অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, ফ্রান্সের সরবোন ও সিএনআরএস, এবং অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য গবেষণা ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোয়ান্টাম ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করছে।

চীন: ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অফ চায়না (USTC), সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ান্টাম যোগাযোগ ও কম্পিউটিং গবেষণায় বড় বিনিয়োগ ও অগ্রগতি দেখিয়েছে।

জাপান: টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়, ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রিকেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে সক্রিয়।

সিঙ্গাপুর: ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সিঙ্গাপুরের সেন্টার ফর কোয়ান্টাম টেকনোলজিস আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

অস্ট্রেলিয়া: নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয় (UNSW) এবং সিডনি বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যার গবেষণায় পরিচিত নাম।

ভারত: ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (আইআইএসসি) বেঙ্গালুরু-তে ন্যাশনাল কোয়ান্টাম মিশনের থিম্যাটিক হাব রয়েছে, যার সঙ্গে আইআইটি দিল্লি, কানপুর, বম্বে, মাদ্রাজ-সহ একাধিক আইআইটি এবং আইআইএসইআর যুক্ত।

তবে এই প্রতিষ্ঠানগুলির তালিকাকে সরাসরি ডিগ্রি কোর্সের তালিকা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কোথাও নির্দিষ্ট ডিগ্রি বা মাইনর কোর্স, কোথাও রয়েছে প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন জাতীয় কোয়ান্টাম উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্যই হল পড়ুয়া, গবেষক এবং অন্যান্য দক্ষ মানবসম্পদের জন্য হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট বা দক্ষতা উন্নয়নের পরিকাঠামো তৈরি করা।

পেশাগত সুযোগ কী?

কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের পড়াশোনা শেষ করে গবেষণা, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, কোয়ান্টাম অ্যালগরিদম, কোয়ান্টাম মেশিন লার্নিং, ক্রিপ্টোগ্রাফি, সাইবার সিকিউরিটি এবং কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যার নিয়ে কাজের সুযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতে ব্যাঙ্কিং, প্রতিরক্ষা, মহাকাশ, স্বাস্থ্য, ফার্মাসিউটিক্যাল গবেষণা, লজিস্টিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও এই দক্ষতার ব্যবহার বৃদ্ধি হতে পারে।

কোয়ান্টাম প্রযুক্তি এখনও অগ্রগতির পর্যায়ে থাকায় এই ক্ষেত্রে গবেষণা এবং উচ্চশিক্ষার গুরুত্ব বেশি। তাই শুধু একটি স্বল্পমেয়াদি কোর্সের বদলে পদার্থবিদ্যা, গণিত, কম্পিউটার সায়েন্স বা ইলেকট্রনিক্স-এর মজবুত ভিত্তির সঙ্গে কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে বিশেষায়িত হওয়াই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর পথ হতে পারে।